
বিশেষ সাক্ষাৎকার: জাহেদ উর রহমান
সরকার আসলে সংখ্যাগরিষ্ঠের কাছে জনপ্রিয় থাকতে চাইছে

জাহেদ উর রহমান। রাজনৈতিক বিশ্লেষক এবং নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সদস্য। অন্তর্বর্তী সরকারের মূল্যায়ন, দেশের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ রাজনীতি, বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক নিয়ে প্রথম আলোর সঙ্গে কথা বলেছেন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মনজুরুল ইসলাম ও রাফসান গালিব
প্রথম আলো: একটা গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে ব্যাপক সমর্থন নিয়ে ক্ষমতায় আসে অন্তর্বতী সরকার। ছয় মাস পর এসে কি মনে হচ্ছে সরকারের জনপ্রিয়তায় কিছুটা ভাটা পড়েছে?
জাহেদ উর রহমান: হ্যাঁ, সরকারের জনসমর্থনে ভাটার টান আমি লক্ষ করছি। এই অল্প সময়ের মধ্যে সরকারের আসলে অনেক কিছু করার সুযোগ ছিল না। কিন্তু আমরা দেখতে চেয়েছি, সরকার চেষ্টা করছে এবং ব্যবস্থা নিচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে স্বাভাবিকভাবে তারা হয়তো সফল হতো না। কিন্তু আমি দেখছি তারা আসলে অ্যাকশনই ঠিকমতো নিচ্ছে না।
মানুষকে এখনো আড়াই শ-তিন শ টাকা বাঁচানোর জন্য কয়েক ঘণ্টা টিসিবি ট্রাকের লাইনে দাঁড়াতে হচ্ছে। তাঁদের কাছে সংস্কার, পরিবর্তন এসব বিষয় আর গুরুত্বপূর্ণ থাকছে না। তাঁরা দেখছেন, জিনিসপত্রের দাম ঠিক থাকছে না, ভ্যাট বাড়ানো হচ্ছে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির তেমন কোনো উন্নতি নেই। একেকজন একেক কারণে ক্ষুব্ধ হচ্ছেন এবং শেষ পর্যন্ত সরকারের জনসমর্থনে ভাটার টান হচ্ছে।
প্রথম আলো: শুরুতে জাতীয় ঐক্যের কথা বলা হলেও সংবিধান বাতিল, জুলাই ঘোষণাপত্র—এ বিষয়গুলো নিয়ে বিভিন্ন পক্ষের মতভিন্নতা দৃশ্যমান হয়েছে। রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সরকারের একধরনের দূরত্ব রয়েছে, এমন কথাও বলছেন কেউ কেউ। আপনি কী মনে করেন?
জাহেদ উর রহমান: মনে রাখতে হবে, শেখ হাসিনার পতনের আগে পরিস্থিতি ছিল ভিন্ন। এক দফায় ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার বিলোপের কথা বলা হলেও মানুষ একত্র হয়েছিল হাসিনার পতনের জন্য। তাঁর পতনের পর একেকজনের একেক রকম এজেন্ডা তৈরি হয়েছে। যে রাজনৈতিক দলের ভোটে জেতার সম্ভাবনা আছে, তারা মনে করল, দ্রুত নির্বাচন হলে তারা দ্রুত ক্ষমতায় যাবে। এ কারণেই প্রথম দিকে বিএনপি তিন মাসের মধ্যে নির্বাচন চেয়েছিল।
প্রথম আলো: সরকার আমলাতন্ত্রের ওপর খুব বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে বা আমলারা নানাভাবে সরকারের জন্য প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছে—এমন আলোচনাও আছে। এ ব্যাপারে আপনার মত কী?
জাহেদ উর রহমান: আমলাতন্ত্রের কথা প্রধান উপদেষ্টা নিজেও বলেছেন। এটা পলিটিক্যাল গভর্নমেন্ট (রাজনৈতিক সরকার) নয়, কিন্তু এই সরকার তো জলে ভেসে আসেনি। বাংলাদেশের ইতিহাসে এ রকম জনসমর্থন আর কোনো সরকারের ছিল না। সেনাবাহিনীও চমৎকারভাবে সমর্থন বজায় রেখেছে।
এই সবকিছুর পরও যদি সরকার আমলাদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে না পারে, সেটা পুরোপুরি সরকারের ব্যর্থতা বলে আমি মনে করি। জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনের চেয়ারম্যানের বক্তব্য নিয়ে তারা যা করেছে, তা চাকরিবিধি ও শৃঙ্খলার পরিপন্থী। এরপর কি সরকার কোনো দৃষ্টান্তমূলক পদক্ষেপ নিয়েছে?

প্রথম আলো: বেশ কিছুদিন ধরে বিএনপি-জামায়াতের বিরোধ রাজনীতির একটা অন্যতম আলোচিত বিষয়। এই বিরোধ কেন হচ্ছে এবং ভবিষ্যতে এটা কোন দিকে যেতে পারে বলে মনে হয়?
জাহেদ উর রহমান: এই বিরোধ কিছুটা রাজনৈতিক বা মতাদর্শিক, বেশির ভাগটাই ভোটের হিসাবের বিবেচনায়। একসময় বিএনপি-জামায়াত একই সঙ্গে আন্দোলন করেছে, এর আগে জোট সরকারও গঠন করেছিল। এখন পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে দল দুটির মধ্যে যা হচ্ছে, সেটা স্বাভাবিক।
শেষের ১০ বছর আওয়ামী লীগ কোনো রাজনৈতিক দল ছিল না, এটা ছিল একটা মাফিয়া গ্যাং। যত দিন পর্যন্ত পার্টি হিসেবে ছিল, দলটি মধ্যপন্থী ও মধ্য বামপন্থী মানুষের প্রতিনিধিত্ব করেছে। এখন যেহেতু আওয়ামী লীগ নেই, নতুনভাবে রাজনীতির মেরুকরণ হচ্ছে। বিএনপি যে মধ্যপন্থী রাজনীতি শুরু করেছিল, সেটা কিছুটা ডানপন্থার দিকে ছিল। এখন তারা মধ্যপন্থায় থাকতে চাইছে, মুক্তিযুদ্ধ প্রশ্নে আগের চেয়ে উচ্চকিত হচ্ছে।
প্রথম আলো: ন্যূনতম কিছু সংস্কার করে দ্রুত নির্বাচন দেওয়ার কথা বলেছে বিএনপি। অন্যদিকে ছাত্রদের প্ল্যাটফর্মগুলো বিএনপির এ অবস্থান নিয়ে সমালোচনা করেছে। এ মতভিন্নতাকে আপনি কীভাবে দেখেন?
জাহেদ উর রহমান: নির্বাচনের সময় নিয়ে রাজনৈতিক শক্তিগুলো আসলে তাদের সুবিধার জায়গা থেকে কথা বলছে। জাতীয় নাগরিক কমিটি বা ছাত্রদের দল গোছানোর জন্য সময় প্রয়োজন। এ কারণে নির্বাচন দেরিতে হলে তাদের সুবিধা হবে। কিন্তু বিএনপির তৃণমূল পর্যন্ত দল গোছানো আছে। তারা যেকোনো সময় নির্বাচনে যেতে প্রস্তুত।
এ কারণেই নির্বাচন ও সংস্কার নিয়ে রাজনৈতিক শক্তিগুলোর মধ্যে একধরনের বাগ্বিতণ্ডা হচ্ছে। কোনো একটি পক্ষ তাদের মতো করে কিছু চাইলেই তা হবে না। সরকারের কাছ থেকে কে কতটুকু কী অর্জন করতে পারবে, তা আসলে নির্ভর করছে, মাঠে কার কতটুকু শক্তি আছে, তার ওপর।
নির্বাচন নিয়ে অধ্যাপক ইউনূস একটি সময়সীমার কথা বলেছেন। আমি মনে করি, বাংলাদেশে যত দ্রুত সম্ভব একটা নির্বাচিত সরকার আসা উচিত। এই বছরের মধ্যে নির্বাচনের যে কথা বলা হচ্ছে, সেটিই আমার কাছে অধিক যুক্তিযুক্ত মনে হয়।
আমরা দেখছি শেখ হাসিনার পতনের পর ভারতের দিক থেকে একটা ন্যারেটিভ দাঁড় করানোর চেষ্টা হয়েছে। সেটা হলো, বাংলাদেশ উগ্র ইসলামপন্থার দিকে চলে গেছে। এসব ঘটনায় ভারতের সেই ন্যারেটিভই প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে। তাই এ ধরনের ঘটনার পেছনে কারা রয়েছে, তা খুঁজে বের করা দরকার।
রাজনীতিকে মোটাদাগে দুই ভাগে ভাগ করা যায়। একটা পরিচয়বাদী, আরেকটা জনকল্যাণভিত্তিক। পরিচয়বাদী রাজনীতি মানুষ ও সমাজকে বিভক্ত করে। অন্যদিকে জনকল্যাণভিত্তিক রাজনীতি মানুষের আর্থসামাজিক উন্নতির চেষ্টা করে। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্যি, বাংলাদেশে পরিচয়বাহী রাজনীতিটা মাথাচাড়া দিচ্ছে। অনেকেই পরিচয়বাদী সিম্বল বা প্রতীক সামনে নিয়ে আসার চেষ্টা করছে। এই রাজনীতি দিয়ে জনগণের কোনো উপকার হবে না।
প্রথম আলো: বাংলাদেশ-ভারতের সম্পর্কের টানাপোড়েনকে কীভাবে দেখছেন? দুই দেশের ভবিষ্যৎ সম্পর্ক কেমন হবে?
জাহেদ উর রহমান: দেখেন ভূরাজনীতিতে একটি বেসিক কথা আছে, প্রতিবেশী পাল্টানো যায় না, বন্ধু পাল্টানো যায়। এটা আমাদের দিক থেকে যেমন সত্য তাদের দিক থেকেও সত্য। কিন্তু ভারত কখনো এই বিষয়টিকে সমর্থন করেছে বলে মনে হয় না। শেখ হাসিনার পতনের পর তারা বিষয়টিকে যেভাবে ডিল করার চেষ্টা করেছে, এটা ভুল হয়েছে। এখন ভবিষ্যতে কী দেখছি?
আমি খুব সিরিয়াসলি মনে করি যে ভবিষ্যতে ভারত আসলে আমাদের সঙ্গে খুব বেশি দিন শত্রুতা বা নেতিবাচক সম্পর্ক চালিয়ে নিতে পারবে না। এর দুটো কারণ। একটা হচ্ছে অর্থনৈতিক। কারণ তারা প্রচুর পণ্য আমাদের এখানে রপ্তানি করে। চিকিৎসার জন্য, ঘুরতে ও কেনাকাটা করতে আমাদের প্রচুর মানুষ যান সেখানে। সেটি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় হাসপাতালে এখন রোগী কমে গেছে। হোটেল, মার্কেট ও রেস্তোরাঁ ব্যবসায় ধস নেমেছে।
প্রথম আলো: সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।
জাহেদ উর রহমান: আপনাদেরও ধন্যবাদ।
Post a Comment